রবিবার, নভেম্বর ২৯, ২০২০
সাম্প্রতিক শিরোনাম

আজ সোমবার, ৩০শে নভেম্বর ২০২০
১৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৪ই রবিউস সানি ১৪৪২

নতুন ইতিহাস সৃষ্টিকারী গেম চ্যাঞ্জার অস্ত্র কমব্যাট ড্রোন বা আনম্যানড এরিয়াল ভ্যাসেলস

নতুন ইতিহাস সৃষ্টিকারী একটি গেম চ্যাঞ্জার অস্ত্র হতে যাচ্ছে উচ্চ প্রযুক্তির কমব্যাট ড্রোন বা আনম্যানড এরিয়াল ভ্যাসেলস (ইউএভি) সিস্টেম! (প্রথম পর্ব)

বর্তমান সময়ে এক বিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক এভিয়েশন প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে আরো আধুনিক এবং উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে শুরু করে দিয়েছে কমব্যাট এণ্ড ননকমব্যাট ড্রোন বা আনম্যানড এরিয়াল ভ্যাসেলস (ইউএভি) সিস্টেম। যার স্পষ্ট আলামত কিনা এখনই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধক্ষেত্রে জড়ালোভাবে দেখা দিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে অতি সাম্প্রতিক সময়ে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে ঘটে যাওয়া ৪৪ দিনের এক সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ বদলে দিতে চলেছে এক বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধ পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চ প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সাজ সরঞ্জাম ব্যবহারের কৌশল। আসলে যুদ্ধটি ছিল মুলত প্রচলিত ভারী অস্ত্রের সাথে অত্যাধুনিক উচ্চ প্রযুক্তির কমব্যাট ড্রোন (ইউএভি) এরিয়্যাল সিস্টেমের এক ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা।

আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রচলিত অপেক্ষাকৃত বড় এবং ভারী আকারের অস্ত্র যেমন রাশিয়ার টি-৭২, টি-৯০ মেইন ব্যাটল ট্যাংক, এস-৩০০ এবং পান্তাসির এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, আর্টিলারি সিস্টেম এবং কমব্যাট সাজোয়া যান ইত্যাদির বিপক্ষে আজারবাইজান সামরিক বাহিনীর ব্যবহার করা তুরস্কের তৈরি উচ্চ প্রযুক্তির হালকা বায়রাক্তার টিবি-২ এবং ইসরাইলের কামিকাজ সুসাইড কমব্যাট ড্রোনের কাছে শোচনীয়ভাবে ধ্বংস এবং পরাজিত হতে থাকে। যদিও আর্মেনিয়ার সামরিক বাহিনী ম্যানপ্যাড মিসাইল সিস্টেম দিয়ে অসংখ্য আজেরি ড্রোন ধ্বংস করেছে বলে দাবি করে থাকে। আর তাই আধুনিক যুদ্ধ কৌশল এবং অস্ত্রে প্রয়োগ নিয়ে কিন্তু বৈশ্বিক পর্যায়ের সামরিক বিশ্লেষক এবং বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করেছে। এই যুদ্ধ চূড়ান্তভাবে দেখিয়েছে যে, তুলনামূলক স্বল্প মূল্যের হালকা কমব্যাট ড্রোন (ইউএভি) এরিয়াল সিস্টেম দিয়ে কিভাবে ব্যাপক আকারের ক্ষতি এড়িয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সম্ভব।

মুলত ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের কমব্যাট ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে রণাঙ্গনে নতুন মাত্রায় এক আধুনিক যুদ্ধ পদ্ধতি শুরু করলেও সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া, লিবিয়া এবং সর্বশেষে নার্গানো-কারাবাখ যুদ্ধে সফল কমব্যাট ড্রোন (ইউএভি) প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রয়োগ যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্বের সকল হিসেব নিকেশ বদলে দিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে মাত্র। এখন বিশ্বের অধিকাংশ ধনী দেশ তাদের সামরিক বহরে প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্রের পাশাপাশি কমব্যাট এণ্ড নন-কমব্যাট ড্রোন ক্রয় কিংবা সংগ্রহে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে ইতোমধ্যেই নিজেদের মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে। আজ আধুনিক বিশ্বে যে দেশই নিজস্ব প্রযুক্তির কমব্যাট এণ্ড নন-কমব্যাট ড্রোন (ইউএভি) প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে দেশই এগিয়ে থাকবে, সেই দেশ কিন্তু নিশ্চিতভাবে তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। আর সিরিয়া এবং নার্গানো-কারাবাখ যুদ্ধে তুরস্কের তৈরি বায়রাক্তার টিবি-২ এবং ইসরাইলের সুসাইড কামিকাজ কমব্যাট ড্রোনগুলো প্রমাণ করে দিয়েছে যে, অপেক্ষাকৃত হালকা এবং উচ্চ প্রযুক্তির কমব্যাট ড্রোন সিস্টেম বিশ্বের যে কোন এয়ার ডিফেন্সকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে।

আরও পড়ুন -  উসমানীয় খেলাফতের দেশ তুরস্কের নব্য উত্থান এবং ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ!
আরও পড়ুন -  উসমানীয় খেলাফতের দেশ তুরস্কের নব্য উত্থান এবং ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ!

বর্তমানে সারা বিশ্বে কমব্যাট এণ্ড নন-কমব্যাট ড্রোন (ইউএভি) প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য প্রায় ৩০.০০ বিলিয়ন ডলার। যা কিনা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌছে যেতে পারে। তবে এখনে কিন্তু শান্তিপূর্ণ বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত ড্রোনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয় নি। আর যে সমস্ত দেশ নিজের ড্রোন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবে না তারা কিন্তু ঠিকই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যায় করবে কমব্যাট এণ্ড নন-কমব্যাট ড্রোন আমদানিতে। তাছাড়া চলতি ২০২০ সালে তুরস্কের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কার মাকিনা এবং তুর্কী এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজসহ বেশকিছু ডিফেন্স সিস্টেম ম্যানিফ্যাকচারিং হাবগুলো প্রায় ৩.০০ বিলিয়ন ডলারের ড্রোন সরবরাহ ও রপ্তানির নতুন অর্ডার পেয়েছে। বিশেষ করে কাতার, ইউক্রেন, লিবিয়া, আজারবাইজান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তানসহ বেশকিছু দেশ তুরস্কের তৈরি ড্রোন ক্রয় করার প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়েনের মেয়ে জামাইয়ের ড্রোন ম্যানুফ্যাকচারিং জায়ান্ট কর্পোরেশন বায়কার মাকিনা তাদের নতুন প্রজন্মের বায়রাক্তার আকেনসি এবং তুর্কী এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ (টিআইএ) আকসুংগুর নামক হেভী কমব্যাট ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে এবং তারা কিন্তু ইতোমধ্যেই এই কমব্যাট ড্রোন সিস্টেমের বেশকিছু সফল চুড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। মনে করা হচ্ছে আগামী ২০২২-২৩ সালের দিকে তুরস্কের সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হবে বায়রাক্তার আকেনসি এবং আকসুংগুর নেক্সড জেনারেশন কমব্যাট ড্রোন (ইউএভি)। আর ভবিষ্যতে এই দুই নতুন ডিজাইনের টুইন ইঞ্জিনের নতুন ড্রোন হতে যাচ্ছে তুর্কী এরদোয়ান সামরিক বাহিনীর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি গেম চেঞ্জার অস্ত্র। তাছাড়া আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে তুর্কী সামরিক বাহিনী এই নতুন প্রজন্মের প্রায় ২০০টি কমব্যাট ড্রোন সার্ভিসে রাখার মহা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। যদিও এখনো পর্যন্ত তুরস্ক তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির ড্রোনের ইঞ্জিন এভিয়নিক্স এবং ইমেজিং সেন্সর কানাডা, অস্ট্রিয়া কিংবা ইউক্রেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে থাকে। তবে এবার তুরস্কের ডিফেন্স রিলেটেড ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাবগুলো নিজেরাই দেশের মাটিতে ড্রোনের ইঞ্জিন তৈরির প্রাথমিক ধাপ শেষ করেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি নতুন প্রজন্মের টুইন ইঞ্জিনের শক্তিশালী কমব্যাট ড্রোনগুলোতে শতভাগ দেশীয় ইঞ্জিন, রাডার, এভিয়নিক্স এণ্ড ইমেজিং সিস্টেম ব্যবহার শুরু করতে যাচ্ছে দেশটি।

আরও পড়ুন -  বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নব বিমানসেনা দলের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত
আরও পড়ুন -  উসমানীয় খেলাফতের দেশ তুরস্কের নব্য উত্থান এবং ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ!

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরাইল, চীন এবং তুরস্ক নিজস্ব প্রযুক্তির ড্রোন ডিজাইন ও তৈরিতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখানে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ড্রোন ইঞ্জিনিয়ারিং এণ্ড ডেভলপমেন্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বুকে প্রথম স্থানে রয়েছে। আর ড্রোন প্রযুক্তির আঁতুড়ঘর হিসেবে কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশ ইসরাইলকে বিবেচনা করা হয়। তাছাড়া ইউরোপের উন্নত দেশগুলো যেমন জার্মান, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং সর্বপরি বিশ্বের আরেক সুপার পাওয়ার রাশিয়া প্রায় এক শতাব্দি ধরে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির অত্যাধুনিক জেট ফাইটার, বোম্বার এবং হেলিকপ্টার তৈরি করে গেলেও কমব্যাট এণ্ড ননকম্ব্যাট ড্রোন (ইউএভি) প্রযুক্তিতে আজো নিজেদের যোগ্য স্থান করে নিতে পারেনি। তবে অনেক দেড়িতে হলেও রাশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপের বেশকিছু দেশ কমব্যাট ড্রোন ইঞ্জিনিয়ারিং এণ্ড ডেভেলপমেন্টে বিলিয়ন ডলারের অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করে দিয়েছে।

সিরাজুর রহমান (Sherazur Rahman), সহকারী শিক্ষক ও লেখক, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ। sherazbd@gmail.com

সর্বশেষ খবর

জনপ্রিয় খবর