শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২০
সাম্প্রতিক শিরোনাম

আজ শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০
১৫ই কার্তিক ১৪২৭, ১৩ই রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আজ বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৪৯ তম শাহাদাত বার্ষিকী

‘একাত্তরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মতিউর সপরিবারে দুই মাসের ছুটিতে আসেন ঢাকা। ২৫ মার্চের ভয়াবহতা দেখে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়েও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সাথে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প খোলেন মতিউর। বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকলেন।’

মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র দিয়ে গড়ে তুললেন একটি প্রতিরোধ বাহিনী ৷ ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বিমান বাহিনী এফ-৮৬ স্যাবর জেট থেকে তাঁদের ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে ৷ মতিউর রহমান আগেই আশঙ্কা করেছিলেন ৷ তাই ঘাঁটি পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পান তিনি ও তাঁর বাহিনী ৷

এরপর, ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকা আসেন ও ৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান। সিদ্ধান্ত নেন বিমান নিয়ে ভারতে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করবেন। ২০ আগস্ট শুক্রবার ফ্লাইট শিডিউল অনুযায়ী রশিদ মিনহাজের উড্ডয়নের দিন ছিলো। মতিউর পূর্ব পরিকল্পনা মতো অফিসে এসে শিডিউল টাইমে গাড়ি নিয়ে চলে যান রানওয়ের পূর্ব পাশে। সামনে পিছনে দুই সিটের প্রশিক্ষণ বিমান টি-৩৩ । শিক্ষানবিশ রশিদ মিনহাজ বিমানের সামনের সিটে বসে স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে নিয়ে আসতেই তাঁকে ক্লোরফরম অজ্ঞান করে ফেলে দিয়ে বিমানের পেছনের সিটে লাফিয়ে উঠে বসলেন।

জ্ঞান হারাবার আগে মিনহাজ রেডিওতে বলে ফেললেন, তিনি সহ বিমানটি হাইজ্যাকড হয়েছে। ছোট পাহাড়ের আড়ালে থাকায় কেউ তাদের দেখতে না পেলেও কন্ট্রোল টাওয়ার শুনতে পেল তা। বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতিউর বিমান নিয়ে ছুটে চললেন। রাডারকে ফাঁকি দেবার জন্য নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে অনেক নিচ দিয়ে বিমান চালাচ্ছিলেন তিনি। রেডিও বার্তা শুনে চারটি জঙ্গি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। এ সময় রশীদের সাথে মতিউরের ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রশীদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন এবং বিমান উড্ডয়নের উচ্চতা কম থাকায় রশীদ সহ বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

মতিউরের সাথে প্যারাসুট না থাকাতে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃতদেহ ঘটনাস্থল হতে প্রায় আধ মাইল দূরে পাওয়া যায়। রশীদ মিনহাজকে পাকিস্তান সরকার সম্মানসূচক খেতাব দান করে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামে মিনহাজের মৃত্যুর জন্য গর্ববোধ করে ৩০ আগস্ট, ১৯৭১ এ ‘আমরা গর্বিত’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে আল্লামা মতিউর রহমান নিজামীর বয়ানে। পরবর্তীতে, ১ সেপ্টেম্বর ‘শহীদ মিনহাজের জীবনের শেষ কয়েকটি মূহুর্ত’ শিরোনামে পরিবেশিত সংবাদে মতিউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক ও মিনহাজ রশীদকে শহীদ বলে আখ্যায়িত করে। ৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ছাত্র সংঘের প্রধান নিজামী মিনহাজের পিতার কাছে একটি শোকবার্তা পাঠান। সেই শোকবার্তায় নিজামী বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে ভারতীয় এজেন্ট বলে উল্লেখ করে। সেখানে নিজামী আরো বলেছিল যে পাকিস্তানি ছাত্রসমাজ তার পুত্রের মহান আত্মত্যাগে গর্বিত। ভারতীয় হানাদার ও এজেন্টদের মোকাবেলায় মহান মিনহাজের গৌরবজ্জল ভূমিকা অক্ষুণ্ন রাখতে তারা বদ্ধ পরিকর।

সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে পাকিস্তান সরকার রশিদ মিনহাজকে শহীদের মর্যাদা দেয়। তাকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘নিশান-ই-হায়দার’ এ ভূষিত করা হয়। তার নামে পাকি বিমান বাহিনীর একটা ঘাঁটির নামকরন করা হয়, করাচীর একাধিক রাস্তার নামকরন হয়। ২০০৫ সালে তার ছবি সংবলিত দুই টাকার একটি ষ্ট্যাম্পও বের হয়।

সম্ভবত এটা পৃথিবীতে এক বিরলতম ঘটনা- যেখানে একই ঘটনার দুই পক্ষের দু’জন লোক দুটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাব প্রাপ্ত হয়েছিলো এবং বল বাহুল্য আজকে রশিদ মিনহাজেরও মৃত্যু দিন।

সর্বশেষ খবর

জনপ্রিয় খবর