আল জাজিরার চিত্রনাট্য এবং কিছু কথা

এক অগ্রজ বন্ধু বেশ আক্ষেপ করে বললেন, এককালে শকুনরা মরা গরু খোঁজে বেড়াতো। আজকাল তারা কবিতা লিখা শুরু করেছে। সম্প্রতি আল জাজিরা একটি ড্রামাটিক / সিনেমাটিক রিপোর্ট প্রকাশ করলে তা’ জনমনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। তোলপাড় সৃষ্টি হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কারো কারো কাছে এটি এখন বিনোদনও বটে! কেউ কেউ আবার এতে খুঁজে পেতে চান কবিতার রসদ। না জেনে না বুঝে, যাচাই বাছাই না করে খুশিতে গদগদ হয়ে ওঠা ওই রসদ ওয়ালারাই আজকের কাব্য রসিক শকুনসমেত।

hiastock

শকুনদের নিয়ে কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। আল জাজিরায় প্রচারিত ‘নিউজ’ সিনেমাটিই আমার আজকের প্রতিপাদ্য বিষয়। তবে এ বিষয়ে কথা বলার আগে আল জাজিরার চরিত্র নিয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই।

একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আল জাজিরার আত্মপ্রকাশ ঘটলেও চ্যানেলটি কালক্রমে সখ্য গড়ে তোলে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও টেররিজমের মতো অন্ধকার দুনিয়ার লোকদের সাথে। এমনকি, এখন এ স্যাটেলাইট চ্যনেলটি বিভিন্ন বিতর্কিত, স্পর্শকাতর ও মিথ্যে খবর পরিবেশনে লিপ্ত হয়ে পড়েছে! ফলশ্রুতিতে খোদ আরববিশ্বসহ পাশ্চাত্যের অনেক দেশও চ্যানেলটির প্রতি ক্ষেপে যায় এবং বিভিন্ন সময়ে তা বয়কট করতে বাধ্য হয়।

গুগল এডস

এ মিডিয়াটির পেছনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মিথ্যে ও ভিত্তিহিন সাংবাদিকতার কারণে আলজেরিয়ান সরকার দু’হাজার চারে (২০০৪) আল জাজিরার এক সংবাদকর্মীকে প্রতিহত করেন। বাহরাইন একই দোষে দু’ হাজার দুই (২০০২) থেকে চার সাল পর্যন্ত আল জাজিরার সংবাদ পরিবেশন বা তার দেশে অফিসিয়াল কার্যক্রম চালু রাখার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেন। শুধু তাই নয়, উগ্রপন্থি সংবাদ পরিবেশনের জন্য আরব নিজেও অসন্তোষ প্রকাশ করে।

আল জাজিরার বিরুদ্ধে ভুয়া ও উস্কানিমূলক সংবাদ প্রচারের এরকম অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে এবং সময়ে অসময়ে বিভিন্ন দেশে এর সম্প্রচার বন্ধ রয়েছে।

ভুয়া সংবাদ প্রচারের অভিযোগে মিশরে আটক হন এ টেলিভিশন নেটওয়ার্কটির বেশ কয়েকজন সংবাদিক। ইরাক যুদ্ধের সময় বিতর্কিত সংবাদ প্রচারের অভিযোগে সাংবাদিকদের বহিষ্কার ও সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়দাকে সমর্থনের অভিযোগে ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেনে আটক হন চ্যানেলটির এক সাংবাদিক। প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, সাংবাদিকদের হলুদ সাংবাদিকতায় বাধ্য করা, জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ এবং অনৈতিকভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা ইত্যাদি অভিযোগ এনে আল জাজিরার ব্যুরো প্রধান মোহাম্মদ ফাহমিসহ মিশরে ২২ জন সাংবাদিক পদত্যাগ করেন। একই অভিযোগ এনে এবং জাজিরাকে অপপ্রচারের মেশিন হিসেবে অভিহিত করে পদত্যাগ করেন লিবিয়া প্রতিনিধি আলী হাশেম, বার্লিন প্রতিনিধি আখতাম সোলায়মান।

২০১২ সালে আল জাজিরা বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলার জন্য গোলাম আজমকে নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তখনো এ চ্যানেলটির বিরুদ্ধে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। আমি নিজেও এর প্রতিবাদ জানিয়ে একটি কলাম লিখি। পাঠকের উদ্দেশ্যে লিংটি দিয়ে রাখলাম।
https://blog.bdnews24.com/frubel/68229

এই যদি হয় আল জাজিরার আসল চরিত্র তবে এটি যা’ প্রকাশ করবে তাই কি আমাদের গিলতে হবে? অনেক সময় চোখে যা দেখা যায় তাও সত্য হয় না। তুর্কি সিরিয়াল ইউনুস এমরের একটু অংশ পাঠকের সাথে শেয়ার করতে চাই। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে একজন বিচারক এক দরবেশের দেখা পান। নামাজ আদায়ের সময় হলে তাঁরা দু’জন এক জায়গায় থেমে অজু করছিলেন। ঠিক ওই মুহূর্তে বিচারক সাহেব একটু দূরে গোংগানির শব্দ শুনতে পান। ঘাড় ফিরিয়ে দেখেন একজন লোক একটি মৃতদেহ সরাতে চেষ্টা করছে। তিনি চিৎকার দিয়ে ধাওয়া করতেই ঐ লোক দৌড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখলেন একটি নয়, দু’টো লাশ। তাকে ধরতে না পেরে দরবেশের কাছে ফিরে এলেন এবং পালিয়ে যাওয়া লোকটিকে খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করলেন। দরবেশ বললেন, এই লোকটিই যে খুনী তা আপনি নিশ্চিত হলেন কি করে? এ কথা শুনে বিচারক বেশ উত্তেজিত হয়ে যান। একটু রাগান্বিত হয়েই তিনি বললেন, নিজের চোখে যা’ দেখেছি তাকে আপনি মিথ্যে বলছেন! এর চেয়ে বড়ো উপহাস আর কি হতে পারে! দরবেশ নিজের পরিচয় গোপন রেখে শুধু বললেন, চোখে যা দেখা যায় তা সব সময় সত্য হয় না, বিশ্বাসও করা যায় না। আবার না দেখেও অনেক কিছু বিশ্বাস করতে হয়।

যা হোক, বেশ কিছু দিন পর বিচারক ওই পালিয়ে যাওয়া লোকটিকে ধরতে পারেন এবং তাকে ফাঁসির রায় দেন। কিন্তু লোকটি এতোই ভালো ও ফরহেজগার ছিলন, যে কারণে কেউ এ রায় মেনে নিতে পারছিলেন না। স্থানীয় জনগণের আপত্তি বিচারককে ভাবিয়ে তোলে। তিনি বিচারটি পূনঃতদন্ত করতে বাধ্য হন। যেখানে মৃতদেহগুলো দেখেছিলেন তাঁর সহকারীকে নিয়ে আবারো সেখানে যান। নতুন ক্লু পান। ওই ক্লু অনুযায়ী এগিয়ে গিয়ে আসল খুনীকে ধরতে সক্ষম হন। যাকে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছিলো তাকে বেকসুর খালাস দেন। অর্থাৎ, বিচারক স্বচক্ষে যাকে খুনী হিসেবে দেখেছিলেন তিনি আসলে খুনী ছিলেন না। ছিলেন সবার প্রিয় একজন ভালো মানুষ। সুতরাং চোখের দেখাতেও অনেক সময় ভুল থাকে। তাই নিজের দেখা জিনিসকেও কখনো কখনো বিশ্বাস করতে নেই।

আল জাজিরা প্রদর্শিত চিত্রনাট্যটিও অনেকটা এরকম। এতে যা দেখানো হয়েছে তা ছায়াছবির মতো আকর্ষণীয় মনে হলেও প্রকৃত সত্য কতটুকু- তাই বিচার্য বিষয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে যে কারণে প্রতিবেদনটির সত্যতা নিয়ে সন্দিহান তা নিম্নে তুলে ধরলাম-

১) অাল জাজিরা যে ভুয়া, ভিত্তিহীন, অসত্য, উস্কানিমূলক ও উদ্দেশ্য-প্রণোদিত সংবাদ প্রচার করে তা’ ইতোমধ্যে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।
২) “অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” নামের চিত্রনাট্যটি যার নেতৃত্বে তৈরী করে প্রচার করা হয়েছে তিনি একজন দণ্ডিত অপরাধী ( Convected crim inal) ও বিতর্কিত ব্যক্তি। তার মতো একজন ক্রিমিনালের কাছ থেকে আমরা সত্য ও স্বচ্ছ কিছু আশা করতে পারিনা।

৩) সেনাপ্রধানের দু’ ভাই পলাতক আসামি হওয়া সত্বেও মহামান্য রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে সেনাপ্রধানের ছেলের বিয়েতে যোগদান করে বলে চিত্রনাট্যটিতে বলা হয়েছে। তাদের উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে একটি ছবিকে দাঁড় করানো হয়েছে। কোনো ভিডিও ফুটেজ নেই। আজকের এ ডিজিটাল যুগে যে কোনো জায়গায় যে কোনো ছবির সংযোজন বিয়োজন ঘটানো কোনো বিষয়ই না। এ ছবিটিও যে নীলনক্সাকারীদের কুটিল কারসাজি নয় তা ভাবি কী করে?
৪) বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন নজরদারি করার প্রযুক্তি ইসরায়েল থেকে ক্রয় করেছে বলে যে তথ্য আল জাজিরা প্রচার করেছে তা মোটেও সত্য নয়। কারণ এর প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বলেছে, শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যবহারের জন্য হাঙ্গেরি থেকে সিগন্যাল সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল। কোন নজরদারি সরঞ্জাম নয়। আর এ কথার সত্যতা মেলে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের বক্তব্যে। তিনি বলেন, আল জাজিরার তথ্যচিত্রে যেসব ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের বর্ণনা দেয়া হয়েছে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের বাংলাদেশের সৈন্যদলে সে রকম কোনো সরঞ্জাম নেই। এ থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ইসরায়েল থেকে সরঞ্জামাদি ক্রয় করার বরাত দিয়ে যে সংবাদটি চিত্রনাট্যে তুলে ধরা হয়েছে তা মিথ্যে। কোনো প্রতিবেদনের অংশ বিশেষ যদি মিথ্যে প্রমাণিত হয় তবে সে ক্ষেত্রে পুরো প্রতিবেদনটিই যে মিথ্যে নয় তার কি প্রমাণ আছে?
৫) যে হারিছ আহমেদ বা হাসানের কথাবার্তা কিংবা সংলাপকে হাইলাইটস করে তথ্যচিত্র বানানো হয়েছে সেই হারিছ আহমেদকে এক জায়গায় “সাইকো প্যাথ” বলে অভিহিত করা হয়েছে। সুতরাং একজন সাইকোর কথায় কি যায় আসে? এমন হাজারটা সাইকো রাস্তাঘাটে ঘুরছে ও প্রলাপ বকছে। তাই বলে কি তাদের কথা আমাদের কানে নিতে হবে? গুরুত্ব দিতে হবে? বিশ্বাস করতে হবে? তাছাড়া নিজেদের স্বার্থে এ সাইকোকে কিনে ফেলাও কঠিন কিছু নয়। আল জাজিরা বা চিত্রনাট্যের কুশীলবরা নিজেদের প্রয়োজনে এ কাজটি যে করেননি তা হলফ করে বলি কি করে?
৬) চিত্রনাট্যে কথিত সামি পেশাগতভাবে একজন ব্যবসায়ী। তিনি হুট করে কিভাবে আল জাজিরার ইনভেস্টিগেট টিমের সদস্য হয়ে ওঠেন? ” ডাল মে কুছ কালা হ্যায়” নয়কি?
৭) সামিকে সেনা প্রধানের ইমেইল প্রেরণের বিষয়টিও ধোয়াশামুক্ত নয়। কারণ প্রেরিত ইমেইলটি যে সেনাপ্রধানই পাঠিয়েছেন তার কোনো তথ্য, নমুনা বা প্রমাণ সুস্পষ্টভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়নি।
৮) প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে এসেছে, নিয়মানুযায়ী তাদের সাথে আল জাজিরার কোনো সাংবাদিক বা কর্তৃৃৃৃপক্ষ যোগাযোগ করেনি। প্রদর্শিত বা প্রচারিত বিষয়ের ওপর তাদের কোনো মতামত, বক্তব্য বা বিবৃতি আমলে নিয়ে প্রচারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। যার ফলে প্রতিবেদনটি একপেশে হয়ে গেছে। অার একপেশে সংবাদ সাংবাদিকতার ফর্মুলায় পড়ে না। সুতরাং এটাকে সংবাদ না বলে গীবত বলাই শ্রেয়। গীবত শোনা ও বিশ্বাস করা আদৌ কি সমীচীন?

সুতরাং, আল জাজিরার এ চিত্রনাট্যকে রসগোল্লা ভেবে আনন্দে উল্লসিত হয়ে লম্ফযম্ফ করার কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না।
তা ছাড়া এমন একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রচারের ফলে দেশের ইজ্জত নষ্ট হয়ে গেছে কিংবা মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়ে গেছে বলে যারা চিৎকার করছেন তাদেরকে বলবো, ইজ্জত কোনো ঠুনকো ব্যাপার নয়। নিছক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত কারো অভিযোগে কোনো দেশের মর্যাদাহানি ঘটতে পারে না। যে কেউ যে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারে, সত্য উন্মোচিত না হওয়া পর্যন্ত সে অভিযোগ মূল্যহীন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেও এ কথা প্রযোজ্য। তবে আল জাজিরার চাকচিক্যময় প্রামাণ্যচিত্রটির কারণে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে সাময়িক নিন্দিত হতে পারে বটে, তবে প্রকৃত সত্য প্রকাশ পেলে দশগুণ নন্দিত হবে। এ জন্য সরকার ও সেনাপ্রধানকে কেবলমাত্র বিবৃতি বা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আল জাজিরায় প্রচারিত সংবাদ প্রত্যাখ্যান নয়, বরং এর মোকাবিলা করতে হবে। স্বচ্ছতার সাথে তদন্ত করতে হবে। এ তদন্তের মধ্য দিয়ে প্রতিবেদনে আনীত অভিযোগ যদি সরকার মিথ্যে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়, তবে দেশের মর্যাদা যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি দেশের মানুষসহ পুরো বিশ্ব আল জাজিরার মুখে থুথু ছেটাবে।

লেখক- সাজেদুল চৌধুরী রুবেল, কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
[email protected]

সর্বশেষ খবর

জনপ্রিয় খবর

hiastock