সাম্প্রতিক শিরোনাম

পীর ও মাজার ভিত্তিক ধর্ম চর্চা এবং বিপর্যয়ের মুখে বিশুদ্ধ ইসলামী জীবন ব্যবস্থা (প্রথম পর্ব)

সিরাজুর রহমান:
পীর এবং মাজার বা কবর ভিত্তিক ধর্ম ব্যবস্থা আসলে ইসলামের মূল আদর্শের সাথে সাংঘার্ষিক এবং সাধারণ মানুষকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করার একটি দীর্ঘ মেয়াদী ভয়াবহ প্রক্রিয়া। যদিও ইসলামিক পরিভাষায় পীর বা মাজার ভিত্তিক ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বলতে আদৌ কিছুই নেই এবং এ শব্দটিও কিন্তু আরবি ভাষা থেকে আগত তাও কিন্তু নয়।

তাছাড়া পীর শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে আগত হলেও এর পরিভাষিক প্রচলিত আরবি কোন শব্দ খুজে পাওয়া দুস্কর। তবে এটা সত্য যে, মধ্যযুগে ভারতবর্ষে ইসলাম প্রসার ও প্রচারে আরব থেকে আগত কিম্বা এদেশে জন্মগ্রহণকারী সম্মানিত পীর, ওলী এবং আউলিয়াদের ব্যাপক ভূমিকা বা উচ্চ মর্যাদার গুরুত্ব বিদ্যামান রয়েছে। তবে তা কিন্তু ভারতবর্ষে ইসলামী রাষ্ট্র বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য মোটেও যথেষ্ঠ ছিল না। বরং মধ্যযুগে আরব, উমিয়াদ, আব্বাসী, তুর্কী উসমানীয় খেলাফতের শাসকরা যদি সরাসরি শত বর্ষব্যাপী ভারতবর্ষে সামরিক অভিযান প্রেরণ না করতেন তাহলে আমাদের দেশসহ সমগ্র ভারতবর্ষে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেত কি না তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

বিশেষ করে ইসলামের প্রথম যুগে খলিফা আব্দুল মালিক এবং তার বাগদাদের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ দীর্ঘ মেয়াদী এবং শক্তিশালী ও সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযানের পেক্ষাপটে ভারতবর্ষে ইসলামী খেলাফতের গোড়াপত্তন সম্ভব হয়। তাছাড়া মোহাম্মদ বিন কাশিম এবং ইখতিয়ার বিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খজলির মতো সাহসী এবং সুদক্ষ মুসলিম সমর নায়কদের বাংলায় সামরিক অভিযান এবং আগমন এতদ অঞ্চলে ইসলামী রাষ্ট্র এবং অইন প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক ভূমিকা পালন করা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকতে পারে না।

যা হোক আজকের লেখায় আমি মুলত পীর, খানকা, দরগাহ এবং মাজার ভিত্তিক ধর্ম ব্যবস্থার বাস্তব ভিত্তি এবং এর ধর্মীয় গ্রহণ যোগ্যতা কিম্বা উপযোগিতা নিয়ে স্বল্প পরিসরে এবং আল্লাহ প্রদত্ত আমার স্বল্পজ্ঞানে বিশ্লেষণ মুলক আলোচনা বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব মাত্র। আসলে পীর এবং সুফীবাদ কিম্বা সন্যাসী জীবন ভিত্তিক ধর্ম প্রচার কার্যত ৯ম খ্রিষ্টাব্দ থেকে পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ (ভারতীয় উপমহাদেশ) ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। যদিও এ জাতীয় ধর্ম ব্যবস্থা কার্যত আমাদের এ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ ব্যাতিত বিশ্বের অন্য কোন প্রান্তে খুঁজে পাওয়া বেশ দুস্কর।

তবে এটা নিশ্চিত যে, শাহ জাজাল, শাহ পরান, শাহ মখদুমসহ আরো অনেক সম্মানিত এবং গুণী ওলী এবং আউলিয়া যুগে যুগে বাংলার এই পবিত্র মাটিতে মহান আল্লাহ তালার একমাত্র মননীত পবিত্র ধর্ম ইসালাম প্রচার ও প্রসারে নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন। এ নিয়ে আসলে কারো মনে বিন্দুমাত্র দ্বিমত কিম্বা সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না। তবে একটা কথা না বললেই নয় যে, এই মহান পীর আউলিয়ার ইন্তেকালের বা মৃত্যুর পর তাদের সমাধীক্ষেত্র বা কবরস্থান কিম্বা মাজার কিভাবে সাধারণ মানুষের জন্য ইবাদতের অন্যতম ক্ষেত্র কিম্বা জীবন বাসনা পুরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান বা ক্ষেত্র হতে পারে তা কিন্তু আমার বোধগম্য নয়। তাছাড়া জান্নাতুল বাকীতে মহানবী (সাঃ) কন্যা মা ফাতেমাসহ প্রায় ১০ হাজার সাহাবা-সাহাবী চীর শান্তির নিদ্রায় শুয়ে রয়েছেন। অথচ তাঁদের কারো কবরস্থানে একটি নাম ফলক পর্যন্ত নেই এবং তারাই কিন্তু মহান আল্লাহ তালার প্রথম শারির জান্নাতি মেহমান।

কবরের সামনে বাতি প্রজ্জ্বলন করাকে হারাম সাব্যস্ত করে রাসূলে কারীম সাঃ ইরশাদ করেন-“হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর নবী সাঃ অভিশম্পাত করেছেন (বেপর্দা) কবর যিয়ারতকারীনী মহিলাদের উপর, এবং সেসব লোকদের উপর যারা কবরকে মসজিদ বানায় (কবরকে সেজদা করে) এবং সেখানে বাতি প্রজ্জ্বলিত করে। (জামি তিরমীযী-২/১৩৬)

আমার সম্মানিত ভাই ও বোনেরা একবার ভাবুন তো, পীরের কাছে গেলে যদি সব মন বাসনা কামনা পূরণ এবং আমাদের বাস্তব জীবনের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যেত কিম্বা ইসলামিক জ্ঞান অর্জনের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র যদি শুধুমাত্র পীর বা মৃত ব্যক্তির মাজার/দরগাহ বা খনকা শরিফ হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের সারা দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠিত ৭৫ হাজার মাদ্রাসা বা উচ্চ স্তরের ইসলামিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার কি আদৌ দরকার ছিল? এখানে আমাদের বুঝতে হবে, আমরা বাস্তব জীবনে কোন ধর্ম সংক্রান্ত সমস্যায় পতিত হলে বা নতুন কোন জটিল প্রশ্নের দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য রয়েছে মহান আল্লাহ তালার প্রেরিত পবিত্র আল কোরআন এবং তার প্রেরিত রাসুল মহানবী (সাঃ) এর পবিত্র বানী বা সংরক্ষিত একগুচ্ছ বিষয় ভিত্তিক হাদিস। তাছাড়া তার পাশাপাশি রয়েছে ইজমা, কিয়াস এবং ইসলামী মহান ব্যক্তিদের অসংখ্য জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ভিত্তিক ধর্মীয় গ্রন্থ বা পুস্তক।

আচ্ছা ভাবুন তো মাজার বা কবর পূঁজা করতে গিয়ে এসব মাজার পূঁজারীরা কতোটুকু সহিহ এবং শুদ্ধভাবে পবিত্র আল কুরআন এবং মহানবীর সুন্নাহ অনুসরণ করছে? আপনি বা আমি কখনও কুরআন-হাদীস দিয়ে তা মিলিয়ে দেখেছেন কি? এই সকল কথিত পীর কি আপনাকে জান্নাত দিতে পারে, নাকি রাসুল (সঃ) এর সহিহ সুন্নাত এবং পরিপূর্ণ জীবন বিধান ‘আল-কুরাআন’ আপনাকে জান্নাতে পৌছে দিবে? অবশ্যই পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসেবে একমাত্র পবিত্র ‘আল-কুরাআন’ এবং মহানবী (সঃ) এর সহিহ আল হাদিসই কেবল আপনাকে এবং আমাদের সকলকে জান্নাতের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। আর এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকার সুযোগ নেই।

মাজারে সিজদা দেওয়া, মোমবাতি জ্বালানো, গানের আসর জমিয়ে গাঁজার আড্ডাখনায় পরিণত করাটা কিন্তু কোন ভাবেই মহান আল্লাহর ইবাদত এবং মহানবী (সঃ) এর সুন্নাহ বা আদর্শের মধ্যে পড়ে না। বরং এহেন অপকর্ম করাটা অতি ভয়ানক এবং ক্ষমরা অযোগ্য কবিরা গুনাহের মধ্য পড়ে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “সাবধান! তোমাদের পূর্বের যুগের লোকেরা তাদের নবী ও নেককার লোকদের কবর সমূহ মসজিদ (সিজদার স্থান) হিসেবে গন্য করতো। তবে তোমরা কিন্তু কবর সমূহকে সিজদার স্থান বানাবে না। আমি এরূপ করতে তোমাদের নিষেধ করে যাচ্ছি” । [মুসলিম, ১০৭৭]


রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন,”তোমরা স্বীয় ঘরকে কবর বানিয়োনা। (অর্থাৎ কবরের ন্যায় ইবাদত-নামায, তেলাওয়াত ও যিকির ইত্যাদি বিহীন করনা।) এবং আমার কবরে উৎসব করোনা। (অর্থাৎ বার্ষিক, মাসিক বা সাপ্তাহিক কোন আসরের আয়োজন করনা। তবে হ্যাঁ আমার উপর দুরূদ পাঠ কর। নিশ্চয় তোমরা যেখানেই থাক না কেন তোমাদের দুরূদ আমার নিকট পৌঁছে থাকে। (আল্লাহ তায়ালার ফেরেশতারা পৌঁছিয়ে দেন।)” (সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং-২০৪৪/৪০)
চলমান……


সিরাজুর রহমান (Sherazur Rahman), সহকারী শিক্ষক ও লেখক, ৮২ নং ছোট চৌগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ। sherazbd@gmail.com

সর্বশেষ

ঈশ্বরদীতেও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭.৮ ডিগ্রি

পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। শুরু হয়েছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে হয়ে পড়েছে জনজীবন।বুধবার (১১ জানুয়ারি)...

আফগানিস্তানে অন্তর্ভূক্তিমূলক আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি দেখতে চায় বাংলাদেশ

প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ আফগানিস্তানে অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি দেখতে চায়, যেখানে আফগান জনগণ তাদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে। সম্প্রতি আফগানিস্তানের উচ্চ শিক্ষা এবং...

গণতন্ত্রের নামে বাংলাদেশে অন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই বলছে রাশিয়া

গণতন্ত্রের অজুহাত দিয়ে বাংলাদেশ কিংবা অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের কারো হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই। কোনো রাষ্ট্রে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় জাতিসংঘের ঘোষণায়...

র‍্যাবের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবেনা, লবিষ্টকে জেরার আপিল করতে পারবে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে র‍্যাবের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যপারে শক্তিশালী লবিস্ট নিয়োগ করা হলেও সে পদক্ষেপ ভেস্তে গিয়েছে।এরই মধ্যে র‍্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন-র‍্যাবের ব্যপারে নিষেধাজ্ঞার আবেদন...