সাম্প্রতিক শিরোনাম

বাংলাদেশে ‘কোভিড-১৯ এবং চিকিৎসা ব্যয়’

 ক. বাংলাদেশে চিকিৎসা অপচয়ের মূল কারণ সমূহ

hiastock

বাংলাদেশে ব্যক্তি স্বাস্থ্য খাতে (Out of Pocket : OOP) প্রায় ৭০% ব্যয় হয় যা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। এত অধিক ব্যয়ের মূল কারন বাংলাদেশে কোন রূপ উন্নত মানের প্রাইভেট বা বেসরকারি স্বাস্থ্য বীমা (Private Health Insurance) কিংবা সরকার নিয়ন্ত্রিত জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা (National Health Insurance) না থাকা।

১.রোগীরা চিকিৎসকদের নিকট থেকে ন্যূনতম ৫ মিনিট পরামর্শ সময় না পাওয়ায়, রোগী ও তাঁর আত্মীয় স্বজন চিকিৎসকের উপর আস্থা হারায়, এমন কি নামিদামী চিকিৎসকের উপরও। রোগীর উপসর্গ সমূহের বর্ণনা শেষ করার পূর্বেই চিকিৎসক রোগীকে একটি ব্যবস্থাপত্র (Prescription) ধরিয়ে দেন, কোন ওষুধ কোন উপসর্গ উপসমের জন্য দিয়েছেন, কখন সেবন করতে হবে খাবার পূর্বে না পরে তা চিকিৎসক বুঝিয়ে বলার পূর্বেই পরবর্তী রোগী পরামর্শ কক্ষে প্রবেশ করেন, কোনটা কোন রোগের ওষুধ এবং এসব ওষুধের সম্ভাব্য পাশর্^ প্রতিক্রিয়া (Side Effects), মিথষ্ক্রিয়া (Contraindication) রোগী জানার সময় পায় না, রোগী ওষুধের ব্যবহার সম্পর্কিত পুরো তথ্য না জানার অসন্তোষ নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বার ত্যাগ করেন। সামান্য সমস্যা হলে রোগী ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন এবং অনেক সময়ে অন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

২.রোগীরা চিকিৎসকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দামী ওষুধকে বেশী ভাল ওষুধ মনে করেন। রোগী এবং চিকিৎসক উভয়ে জানেন না যে, দামী (Costly) ওষুধ বেশী নকল এবং ভেজাল (Counterfeit) ও নিম্নমানের (Substandard) হয়। রোগী দামও বেশী দিলেন, আবার অকেজো খারাপ ওষুধ ও সেবন করলেন। রোগ না সারায় প্রতি বছর কয়েক লক্ষ বাংলাদেশী রোগী ভারত, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর ও মালেয়শিয়া এমন কি কতক আমেরিকা ও ইংল্যান্ড যাচ্ছেন এবং বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের কারনে তাদের দূর্নীতি ও দরিদ্রতা বাড়ছে। গবেষক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বিআইডিএস (BIDS) এ কর্মরত থাকা কালীন ১৯৯৪ সনে তথ্য প্রকাশ করেছিলেন যে, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় এবং পুলিশের হয়রানীর কারনে বাংলাদেশে দরিদ্রতার অবসান হচ্ছে না।

৩.চিকিৎসকগন বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানীর মেডিকেল রিপ্রেজেনটিটিভ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। সোজা কথায়, ঘুষ নিচ্ছেন। তারা আর্থিক বিবেচনায় নির্দ্ধারিত কোম্পানীর ওষুধ লেখা ও অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় পরীক্ষা করানোর জন্য ক্লিনিক/ ল্যাবরোটরী থেকে ৫০-৬০% এর বেশী কমিশন বাবদ পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ চিকিৎসকগন অতিরিক্ত দামী ওষুধ লিখছেন এবং

* ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র ** মেডিকেল অফিসার, গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল

অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় পরীক্ষাও (Diagnostic Tests) করাচ্ছেন। সকল প্রাইভেট হাসপাতাল মালিক এবং দূর্নীতিতে অংশ গ্রহন করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বিরুদ্ধে দ্রুত

ব্যবস্থা নিন, ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে। উদাহরন ছাড়া চরিত্র পরিবর্তন হবে না।

৪. চিকিৎসকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রোগীরা ICU/CCU এর সন্ধানে হন্নে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে, এমন কি নাম গোত্রহীন ক্লিনিকে। কতক হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ভেন্টিলেটর, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, ডিফিব্রিলেটর, কার্ডিয়াক মনিটর, ইসিজি ও ইকো এবং বিবিধ সিরিঞ্জ পাম্প থাকলেও ICU পরিচালনার জন্য সার্বক্ষনিক প্রশিক্ষন প্রাপ্ত ICU/CCU বিশেষজ্ঞ নেই।

অথচ হাসপাতালের বিছানার চাদর, মাস্ক, পেপার গাউন, তোয়ালে, জুতার কভার ও বালিশের কভার পরিবর্তন এবং সময়ে অসময়ে বিভিন্ন চিকিৎসক রোগীকে পরিদর্শন (Consultation) করে রোগী থেকে ফি আদায় করছেন। ICU/CCU তে ভর্তি থাকা সময়ে ভেন্টিলেটর, কার্ডিয়াক মনিটর, পালস অক্সিমিটার, সিরিঞ্জ পাম্প, ওষুধের ডোজ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র প্রভৃতি ব্যবহারের জন্য আলাদা আলাদা চার্জ আদায় করা হয়। এটা অনৈতিক এবং দূর্নীতির অংশ। দৈনিক কত লিটার অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়েছে তার হিসাব নেই, অথচ ICU বিদায় কালে ৪০,০০০/৫০,০০০ টাকা অক্সিজেন চার্জ বাবদ রোগী থেকে আদায় করা হয়। দিনে দুপুরে ডাকাতি। দুদক কি করছেন? উল্লেখ্য যে, রোগী বা তাদের আত্মীয় স্বজনরা এমন কি চিকিৎসকগন প্রতি হাজার লিটার o২ (অক্সিজেন) ক্রয় মূল্য জানেন না। তাই প্রাইভেট হাসপাতাল মালিকগণ রোগীদের ঠকায়, প্রতারনা করে। ফলে প্রতিদিন ICU বিল বাড়ে দ্রুত গতিতে, যা দৈনিক ৫০,০০০ থেকে ১৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার থেকে দেড় লাখ) টাকা ও হতে পারে।

সৌভাগ্যবশত গণস্বাস্থ্য ICU তে এমন একজন দায়িত্বে আছেন যিনি অত্যন্ত নিবেদিত এবং কানাডা, বৃটেন, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, সৌদী আরব ও মধ্য প্রাচ্যে ব্যাপক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। ICU বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজীব মোহাম্মদ ২০০১ সনে ইউরোপিয়ান ডিপ্লোমা ইন ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন (EDIC) অর্জন করেছেন। সম্ভবত বর্তমানে বাংলাদেশে অধ্যাপক নজীবের চেয়ে অধিকতর জ্ঞান সম্পন্ন সিনিয়র কোন ICU বিশেষজ্ঞ নেই। পরবর্তীতে তিনি ক্রিটিকেল কেয়ার (Critical Care Unit), Liver ITU ও Multidisciplinary ICU তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত হাসপাতাল সমূহে এবং সিংগাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল ও অষ্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ণ হাসপাতালে প্রশিক্ষন নিয়েছেন ও বিশেষ কর্মদক্ষতা অর্জন করে দেশে ফিরেছেন।

ICU তে রোগী থাকলে তিনি দৈনিক ১৬-১৮ ঘন্টা সময় হাসপাতালে কাটান। ICU বিশেষজ্ঞগন জুনিয়র চিকিৎসক বা নার্সদের ফোন পাবার পর কত দ্রুত হাসপাতালে পৌছেন তার উপর ICU রোগীর জীবন নির্ভরশীল। তাকে দ্রæত ডাকার জন্য তিনি হাসিমুখে সকল জুনিয়রদের ধন্যবাদ জানান, তাদের সংগে নিয়ে ইন্টার্ণ চিকিৎসকদের নিয়ে রোগী দেখেন, রোগী পরীক্ষা করা শেখান এবং পরে আলাদা ভাবে প্যারামেডিক, ওয়ার্ডবয়, ক্লিনার এবং রোগীর আত্মীয় স্বজনকে সযত্নে রোগীর সমস্যা বুঝিয়ে বলেন।

৫. বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞগন একটিও আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নাল কিনে না পড়ায় তাদের জ্ঞানের পরিধি সীমিত হয়ে যাচ্ছে এবং সহজে ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হচ্ছেন, আস্থাহীনতায় ভুগছেন। চিকিৎসকগন ওষুধের মূল্য জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন না। দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি। বাণিজ্যিক (Brand/Trade Name) নামের ওষুধে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে রোগের উপসম না হলে চিকিৎসক এন্টিবায়োটিক বদলিয়ে দেন। প্রকৃত পক্ষে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়তো এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তাই নেই। চিকিৎসকগন ওষুধ লিখেন জিনেরিক (Generic) নামে নয়, বিভিন্ন ব্রান্ড নামে ফলে রোগী ওষুধের প্রকৃত নাম জানতে পারেন না। অনেক সময় খেয়াল করেন না যে ওষুধ লিখছেন তা মূলত একই জিনেরিক গোত্রের। তারা ওষুধের প্রকৃত দামও জানেন না বলে অপ্রয়োজনে বেশী মূল্যের অধিক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সমন্বিত ওষুধ সমূহের বিধিব্যবস্থাপত্র (Prescription) লিখে থাকেন।

খ. বাংলাদেশের গ্রামে প্রথম স্বাস্থ্য বীমার (Health Insurance) প্রচলন

স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সনে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র সাভার এলাকায় একই দরের কিস্তিতে (প্রিমিয়ামে) গণস্বাস্থ্য বীমা (Gonoshasthaya Health Insurance) চালু করে। স্থানীয় প্রত্যেক পরিবার প্রত্যেক মাসে দুই টাকার কিস্তি (প্রিমিয়াম) দিতেন। বিনিময়ে রোগী বিনা ফি তে বিবিধ স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা পেতেন। যেমন পারামেডিক ও চিকিৎসকদের ফ্রি পরামর্শ ও ওষুধ, এবং রক্ত, পায়খানা, প্রস্রাবের সাধারন (Basic) পরীক্ষা সমূহের সুবিধা পেতেন বিনা খরচে। দূর্ভাগ্যবশত: এই নীতিতে না দরিদ্র পরিবার না ধনীরা খুশি ছিলেন। মধ্যবিত্ত ও ধনীরা লাইন করে দরিদ্র রোগীর পিছনে দাড়াতে অস্বস্তি বোধ করতেন। উপরন্তু ধনী ও মধ্যবিত্তরা আলাদা ভাবে প্রাইভেটে বাড়ীতে ডাক্তার নিয়ে দেখাতে চান। উপরন্তু দরিদ্র রোগীরা মনে করতেন যে ধনীদের আয় যেহেতু অনেক বেশী তাদের নিকট থেকেও মাসিক দুই টাকা চাঁদা ধার্য করা যৌক্তিক নয়, ‘গরীবের হক হরণ করা হচ্ছে, তাদের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে, অবস্থাপন্নদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে, খাতির করা হচ্ছ।

একক শ্রেণীর স্বাস্থ্যবীমার পরিবর্তে ১৯৮৫ সনে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার জনসাধারনের সাথে একাধিক আলোচনা সভা করে সাভার সহ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সকল কর্ম এলাকায় সকল জনসাধারনকে ৬টি সামাজিক শ্রেনীতে বিন্যাস করে সামাজিক শ্রেণীভিত্তিক গণ স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হয়- (১) অতি দরিদ্র, (২) দরিদ্র, (৩) নিম্ন মধ্যবিত্ত, (৪) মধ্যবিত্ত, (৫) উচ্চ মধ্যবিত্ত, (৬) ধনী/উচ্চবিত্ত। স্বাস্থ্য বীমাহীনরা ৭ নম্বরে নিবন্ধিত হন। দরিদ্ররা নগন্য প্রিমিয়াম দিয়ে বেশী সুবিধা পান, OPD তে পরামর্শ ফ্রি। কিন্তু অবস্থাপন্ন উচ্চবিত্ত পরিবাররা দেন অনেক বেশী প্রিমিয়াম। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে অবস্থাপন্নরা বেশী ফি দেন। অধূমপায়ী দরিদ্র পরিবার দেন বৎসরে ২০০ টাকা, অপর পক্ষে উচ্চবিত্ত ধনী পরিবার স্বাস্থ্য বীমা দেন বৎসরে ২৮০০ (দুই হাজার আটশত) টাকা, উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার দেবেন ২৪০০ (দুই হাজার চারশত) টাকা এবং অধূমপায়ী মধ্যবিত্ত পরিবার দেন মাত্র ১৮০০ (এক হাজার আটশত) টাকা। প্রতি দুই বৎসর পর পর পর্যালোচনা করে স্বাস্থ্য বীমার প্রিমিয়ামের বিহিত করা হয়। এত কম প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্যবীমা পৃথিবীর কোথাও স্বাস্থ্যবীমা নাই। কিন্তু এ বিষয়ে পর্যালোচনা বা প্রচারে সরকারী আগ্রহ কোনটাই নেই।

ঢাকা শহরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাত্র ৪,৯৮২ (চার হাজার নয়শত বিরাশী) পরিবারের গণ স্বাস্থ্যবীমা আছে (People’s Health Insurance)। অপর পক্ষে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গ্রামীন কর্ম এলাকায় প্রায় পনের লক্ষ লোকসংখ্যার ২২৮,৭৬২ (দুই লক্ষ আটাশ হাজার সাতশত বাষটি) পরিবারের মধ্যে মাত্র ৪৭,৬০৪ (সাত চল্লিশ হাজার ছয়শত চার) পরিবার গণ স্বাস্থ্যবীমা নিবন্ধিত। প্রকৃত পক্ষে যথেষ্ট প্রচার প্রচারনার অভাবে পল্লী এলাকায় গণস্বাস্থ্য বীমার প্রসার হয়নি। ফলে জনসাধারন একটি আধুনিক জনসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

গ. কোভিড-১৯ রোগের সংক্রমন এবং চিকিৎসা

চীনের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল উহান প্রদেশে ২০১৯ সনের নভেম্বর মাসে নভেল করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ আত্মপ্রকাশ করে এবং দ্রুত বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর কারনে প্রথম মৃত্যু ঘটে ৮ ই মার্চ ২০২০ তারিখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৬ শে মার্চের সতর্কবাণীকে বাংলাদেশ সরকার গুরুত্ব দেয়নি। ফলে রোগটি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। করোনা রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে মাগুড়ার চিকিৎসক ডা. খলিলুর রহমান (ফোন – ০১৭১২৮১৯৪০৫, ০১৯৬০৪৬৩৭৩৫) তার অভিজ্ঞতার আলোকে তিন পর্যায়ে ভাগ করে করোনা রোগ ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে একটি ছোট লেখা লিখেছিলেন তা শিক্ষনীয় বলে কিছু অংশ আমি পুন: উল্লেখ করছি।

‘কভিড-১৯ একটি স্পর্শকীয় ভাইরাস (Touching Virus) যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশি থেকে বা আশে পাশের ৩-৬ ফুটের মধ্যে অবস্থিত বস্তু থেকে ব্যক্তিদের অসতর্কতার কারনে ছড়িয়ে পড়ে। স্টেফাইলো কক্কাস, স্ট্রেপটোকক্কাস, নিউমোকক্কাস প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমিত হয়। সাধারনত ৩-১৪ দিনের মধ্যে কোভিড-১৯ উপসর্গ প্রকাশ পায় (Incubation Period) তিন পর্যায়ে।

প্রথম পর্যায়ে ১-৩ দিন: শুরু হয় সাধারন জ্বর, গায়ে মাথায় সামান্য ব্যথা ও শুষ্ক কাশি দিয়ে, যোগ হয় নাক দিয়ে হালকা পানি পড়া (Runny Nose), হাঁচি কাশি ও তৃতীয় দিনে মৃদু শ্বাসকষ্ট। চুলকানী ও হাচিকাশি এলার্জীর লক্ষন।

দ্বিতীয় পর্যায় ৪-৬ দিন: হঠাৎ জ্বর বেড়ে ১০২০ থেকে ১০৪০ ফারেনহাইট উঠে, শুকনা কাশির সাথে শ্লেষ্মা যুক্ত হয়। সর্বত্র মৃদু ব্যথা বিশেষতঃ গলায় (Sore Throat), শ্বাসকষ্ট ক্রমান্বয়ে বেড়ে যায়, (Progressive Dyspnoea) শ্লেষ্মাসহ হাঁচিকাশি বৃদ্ধি এবং খাওয়ায় অরুচি ও অনিদ্রা যোগ হয়। নিউমোনিয়ার (Pneumonia) লক্ষন প্রকাশমান এবং রোগীর অস্বস্তি রোধের সাথে ভীতি সঞ্চার ও লক্ষনীয়।

তৃতীয় পর্যায়: রক্তে অক্সিজেন সংমিশ্রন (O২- Saturation) বিভ্রাটে নিউমোনিয়ার সংক্রমন ও কফ শ্লেষ্মা বৃদ্ধি বুকের ভিতর গড়গড় শব্দ শুনা যায় এবং স্বাভাবিক ভাবে শুয়ে থাকায় অসুবিধা হয়, রোগী ক্রমে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

ঘ. করোনা রোগীর চিকিৎসা ও ব্যয়

প্রথম পর্যায়ে রোগীকে আলাদা ঘরে রেখে আলাদা ভাবে দেখাশুনা করাই মূল কাজ। এলাকার একজন চিকিৎসকের (General Practitioner) নিয়মিত পরামর্শ নিলে ভাল হয়। প্রায় সত্ত¡র থেকে আশি ভাগ (৭০-৮০%) রোগী নিরাময় হয় নিজ বাড়ীতে স্বল্প খরচে, স্বল্প সময়ে ও ¯ স্নেহ ভালবাসায়। বোকামী করতে হবে না একই ওষুধ অকারনে বেশী দামে কিনে, এতে ভালর চেয়ে অন্য সমস্যাও সৃষ্টি হতে পারে।

দিনে ১টা বা ২টা করে ৫০০ মিলিগ্রামের পারাসিটামলের (Paracetamol) টেবলেট দিনে এক থেকে তিনবার সেবন যুক্তি সংগত। পারাসিটামলের সাথে অন্য উপাদান যেমন ক্যাফেইন বা ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত না থাকা ভাল, এতে অন্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিকেলসের পারাসিটামল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশ মত উৎপাদিত, জি-পারাসিটামল, প্রতি টেবলেটের মূল্য সত্তর পয়সা (০.৭০ টাকা) অর্থাৎ ৭ (সাত) টাকায় ১০ টি জি-পারাসিটামল কিনতে পাওয়া যায়। অপর পক্ষে বাণিজ্যিক নামে বাজারজাতকৃত নাপা, নাপা প্লাস, নাপা এক্সট্রা, প্রভৃতি এবং অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত উপাদানসহ প্রস্তুত প্রতি টেবলেট দুই টাকা থেকে আড়াই টাকায় বিক্রি হয়। এতে রোগ দ্রæত সারে না, কিন্তু অর্থের অপচয় হয়।

হাঁচিকাশি অর্থাৎ এলার্জী নিবারনের এন্টি এলার্জী (Anti Allergy) ওষুধ ৪ মিলিগ্রামের ক্লোরফেনারামিন (Chlorpheneramine/ G-Antihistamine Tablet) দিনে একটি করে খেলে ভাল উপকার হয়। প্রতি টেবলেটের মূল্য মাত্র পঁচিশ পয়সা (অর্থাৎ এক টাকায় ৪ টি এন্টিহিস্টামিন টেবলেট কিনতে পাওয়া যাবে)। গরম চা, মধু ও আদায় গলায় আরাম পাওয়া যায়। চুষে চুষে জি-ভিটামিন সি-২৫০ মিলিগ্রাম টেবলেট দিনে ৩/৪ টা খাওয়া যেতে পারে, প্রতি টেবলেট জি ভিটামিন সি মূল্য এক টাকা ত্রিশ পয়সা (১০ টি টেবলেটের মূল্য ১৩.০০ টাকা) অনেকে প্রতিদিন ২০ মিলিগ্রামের একটা বা দুটো জিংক টেবলেট (G-Zinc) গ্রহনের পরামর্শ দেন, খরচ প্রতি টেবলেট ১.০০ টাকা অর্থাৎ ১০ টি জিংক টেবলেটের মূল্য দশ টাকা।

কোয়ারেন্টাইন রুমে (একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক থাকা) অবশ্যই এক বোতল ১০০ মিলিলিটারের জাইনানল বা জি-ক্লোরহেক্সাডিন (G-Chlorhexidine) থাকা দরকার। জীবানুনাশক হিসেবে ব্যবহারের জন্য। ১০০ মিলিলিটারের মূল্য ১০০ টাকা । সাবান ও ব্যবহার করবেন।

ভাল উপকার পাওয়া যায় গরম পানিতে কয়েক ফোটা টিংচার আয়োডিন কিংবা ইউকেলিপট্যাস তেল মিশিয়ে গরম বাষ্প নিলে।

অন্য সমস্যা যেমন পেট বা বুক জ্বালাপোড়া বা এসিড ভাব লাগলে দিনে একটি বা দুটি ২০ মিলিগ্রামের জি -ওমিপ্রাজল (G- Omeprazole) কেপসুল সেবন করলে নিরাময় নিশ্চিত। খরচ প্রতি কেপসুলের মূল্য ৩.০০ (১০ কেপসুলের মূল্য ত্রিশ টাকা)

প্রথম পর্যায়ে নিরাময়ে ব্যর্থ ২০% রোগীকে অবশ্যই নিকটবর্তী সরকারী বা বেসরকারী ক্লিনিক হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে (Isolation Unit) ভর্তি হতে হবে। তবে ভর্তির পূর্বে নিশ্চিত হতে হবে যে, সেখানে ছোট পালস অক্সিমিটার (Pulse Oxymeter) যন্ত্র এবং রোগীকে প্রয়োজন মাফিক সরাসরি অক্সিজেন দেবার সুবিধা আছে। রক্তে পরিমিত অক্সিজেন সংমিশ্রিত না হলে (Oxygen Saturation) রোগীকে মুখে বা নাক দিয়ে অক্সিজেন (Oxygen) কিছুক্ষন দিতে হয়। দেখতে হবে অক্সিজেন সংমিশ্রন ৯২%- ৯৫% মধ্যে যেন থাকে। অতিরিক্ত অক্সিজেন দেয়া অপচয় তো বটে, অনেক সময় ক্ষতিকরও।

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনের অধ্যাপক তারিক আলম করোনা পজিটিভ দ্বিতীয় পর্যায়ের রোগীদের প্রতিদিন একটি এন্টি হেলমিনথিক আইভারম্যাকটিন (Ivermectin) যার প্রতি টেবলেটের মূল্য ৫.০০ (পাঁচ) টাকা এবং ১০০ মিলিগ্রামের ডক্সিসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড টেবলেট দিনে দুইবার পাঁচদিন সেবন করিয়ে রোগ নিরাময় লক্ষ্য করেছেন।

হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি প্রথম দিনে ইনজেকশন মিথাইল প্রেডনিশোলন ২৫০ মিলিগ্রাম ২ টি কিংবা ইনজেকশন ডেক্সামেথাসন ৪ মিলিগ্রাম (G-Dexamethasone 4 mg Injection) মূল্য প্রতি ইনজেকশন মাত্র ১৫.০০ (পনের টাকা) দিনে দুইবার ৩ দিন, খরচ ৯০.০০ (নব্বই) টাকা।

নিউমোনিয়ার চিকিৎসার জন্য কো- এমক্সিক্লেভ (Co- Amoxiclav) ১-২ গ্রাম দিনে তিন বার কিংবা এরিত্রোমাইসিন/ এজিথ্রোমাইসিন অথবা কেপসুল সেফেক্সিম (G- Cefixime 20 mg, মূল্য ২০ টাকা) ৫ দিন সেবনের জন্য দেয়া হয়।

দিনে কয়েকবার গরম জলের বাষ্প বা মেসিনের মাধ্যমে সালবুটামল (G-Salbutamol Solution .০5% mg) মূল্য প্রতি ভায়াল ৮০.০০ (আশি) টাকা কিংবা বুডিসোনাইড (Budesonide 0.5 mg) অথবা এন-এসিটিল (N- acetyl Cysteine- NAC) সংমিশ্রনে নেবুলাইজার ব্যবহারে শ্লেষ্মা বের করায় খুব উপকার পাওয়া যায়।

ব্যয়বহুল এন্টিভাইরাল রেমডিসিভীর (Ramdesivir) ব্যবহারে নিরাময়ে তিনদিন সাশ্রয় করায়। অন্য এন্টি ভাইরালের ব্যবহারে সুফলের প্রমান নেই। অর্থের অপচয় মাত্র। শিক্ষিত পেশাজীবি ও প্রতারিত হচ্ছেন অপ্রমানিত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ৫০,০০০ থেকে এক লাখ টাকায় কিনে। তাদের জ্ঞান চক্ষু কবে উম্মোচিত হবে?

আইসোলেশন (Isolation) ওয়ার্ডে ৮-১০ দিন ভাল নাসিং সেবা ও নিয়মিত চিকিৎসা পেলে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রায় সকল রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরে যান, অনধিক ১০% রোগী বিভিন্ন জটিলতা (Complications) ও একাধিক বিকল অংগের সমস্যা নিয়ে তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে।

তৃতীয় পর্যায়ের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয় বহুল এবং মূলত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (ICU) তে চিকিৎসা করাতে হয়। করোনা রোগে মৃত্যুহার ২-৩% সীমিত।

ঙ. এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন

সারা পৃথিবীতে এমনকি উন্নত বিশে^র চিকিৎসকগন সহজে ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সুলভ ওষুধ থাকা সত্বেও অযাচিত ভাবে অধিকতর মূল্যের ওষুধ লেখেন। নতুন ওষুধের ভুল প্রয়োগ প্রায়শ: লক্ষনীয় ঘটনা। এই সমস্যা রহিত করার লক্ষ্যে প্রায়শ পরামর্শ প্রকাশ করে থাকেন আন্তর্জাতিক পরামর্শক কমিটি NICE (National Institute For Health and Care Excellence)। সময়মত চিকিৎসা না হলে বা চিকিৎসা বিভ্রাট হলে কোভিড-১৯ রোগের মূল সমস্যা হাসপাতালে ভর্তির সময় বা ভর্তির ৪৮ ঘন্টা পূর্বে বাড়ী ও এলাকার পরিবেশ থেকে অর্জিত নিউমোনিয়া (Community acquired Pneumonia) অথবা হাসপাতালে অন্য কারনে আগত রোগীরা হাসপাতালের পরিবেশ থেকে অর্জিত সংক্রমন (Hospital Infection) দ্রæত ফুসফুসের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। সে সমস্যার দ্রæত চিকিৎসার জন্য মে, ২০২০ তারিখে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিষয়ক পরামর্শ কমিটি NICE এর সুপারিশ সমূহ বিশেষ ভাবে প্রণিধানযোগ্য। এন্টিবায়োটিক সাধারনত ৫ দিন সেব্য। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষত : ফুসফুসের সমস্যায় ২/৩ সপ্তাহ এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

চ. স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে অর্জিত (Community Acquired) পরিমিত (Moderate) ও তীব্র (Severe) নিউমোনিয়ার চিকিৎসায়

মুখে (Orally) ডক্সিসাইক্লিন (Doxycline) ২০০ মিলিগ্রাম প্রথম দিনে এবং দ্বিতীয় দিন থেকে ১০০ মিলিগ্রাম করে বা কো- এমক্সিক্লেভ (Co-amoxiclav) ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে তিনবার সংগে ক্লেরিথ্রোমাইসিন (Clarithromycin) ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে দুইবার সেবন করতে হবে। রোগের তীব্রতা (Severity) বেড়ে গেলে লিভোফ্লক্সাসিন (Levofloxacin) ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে একবার বা দুইবার ৫ দিন সেব্য। মুখে সেব্য এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আন্ত শিরায় (Intravenous) পদ্ধতিতে উপরে উল্লেখিত এন্টিবায়োটিক সমূহ ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

হাসপাতালে অর্জিত (Hospital acquired) প্রতিহত (Resistant) নিউমোনিয়া হবার অধিকতর সম্ভাবনা না থাকলে পূর্বে উল্লেখিত এন্টিবায়োটিক সমূহ মুখে ৫ দিন সেব্য নতুবা হাসপাতালে অর্জিত (Hospital acquired) নিউমোনিয়ার তীব্রতা (Severity), প্রদাহ (Sepsis) কিংবা ভেনটিলেটর (Ventilatore) সম্পৃক্ত বা উদ্ভুত নিউমোনিয়া অথবা চিকিৎসা প্রতিহত (Resistance) হবার অধিকতর সম্ভাবনা থাকলে নি¤œলিখিত এন্টিবায়োটিক সমূহ আন্তশিরায় (Intravenous: IV) দ্রুত ব্যবহার বাঞ্ছনীয়। এন্টিবায়োটিক সমূহ হচ্ছে-

* Piperacillin With Tazobactaum (পিপারসিলিন মিশ্রিত টেজোব্যাকটাম, প্রতিবার ৪.৫ গ্রাম করে দিনে তিনবার ইনজেকশন দেয়া শুরু করে, প্রয়োজনে একই মাত্রায় দিনে ৪ (চার) বার দেওয়া যেতে পারে।

* Ceftazidime (সেফটাজিডিম) ২ গ্রাম করে দিনে তিনবার আন্তশিরায় ইনজেকশন।

* কোন কারনে উপরে উল্লেখিত এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা ব্যাহত হবার সম্ভাবনা থাকলে লেভোফ্লোক্সাসিন (Levofloxacin) ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে দুইবার বা ততোধিক বার আন্তশিরায় (Intravenous) দেয়া যুক্তিযুক্ত।

* মেথিসিলিন প্রতিহত করনে সমর্থ (Methicillin Resistant) ষ্টাফাইলোকক্কাস অরিয়স (Staphylococcus Aureous) প্রদাহে অবশ্য দেয়- Vancomycin (ভ্যানকোমাইসিন) প্রতি কিলোগ্রাম ওজনে ২০ মিলিগ্রাম হিসেবে সর্বোচ্চ ২ গ্রাম দিনে তিনবার আন্তশিরায় বা Teicoplanin (টাইকোপ্লানিন) প্রতি কিলোগ্রাম ওজনে ৬ মিলিগ্রাম দিয়ে শুরু দিনে তিনবার করে পরবর্তীতে দিনে একবার দিলে কার্যকর হয়।

* Linezolid (লিনেজোলিড) ৬০০ মিলিগ্রাম দিনে দুই বার মুখে সেব্য কিংবা বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিতে একবার ইনজেকশন দেবার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ওষুধের মূল্যের প্রতি ক্লিনিসিয়ান/ বিশেষজ্ঞদের নজর রাখা উচিত।

দূর্ভাগ্যের বিষয় যে NICE মত সর্বোচ্চ বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ সমূহ দেশের ক্লিনিশিয়ান/ বিশেষজ্ঞগন সতর্কতার সাথে অনুসরন না করায় দেশে এন্টিবায়োটিক প্রতিহতকরন জীবানু (Resistance) প্রতি নিয়ত বেড়ে যাচ্ছে।

ছ. মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে আসা একজন ICU রোগীর চিকিৎসা ব্যয়

২৩ মে ২০২০ তারিখে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ৭৮ বৎসর বয়ষ্ক বিকল কিডনী রোগী জাফরুল্লাহ চৌধুরীর শরীরে করোনা রোগের প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দিলে ২৪ মে ২০২০ তারিখে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের GR-Covid 19 Rapid Dot Blot পরীক্ষায় কোভিড-১৯ পজিটিভ প্রমানিত হয়। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতালে (BSMMU) RT-PCR (Real Time Polymerase Chain Reaction) এ করোনা পজিটিভ প্রমানিত হয়। ৩০ মে রোগীর শ^াসকষ্ট বাড়ে, মানসিক আচরনে বিশৃংখলা ও আচ্ছন্ন ভাব দেখা যায়, রক্তে অক্সিজেন মিশ্রন (Saturation) ৮৫% নেমে আসলে রোগী তন্দ্রাছন্ন হয়ে পড়েন। রোগীকে এই অবস্থায় গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে করোনা নির্দ্ধারিত ICU তে ভর্তি করা হয়। দুই জন বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক বিগ্রেডিয়ার মামুন মুস্তাফী এবং ICU বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজীব মোহাম্মদ সার্বক্ষনিক ভাবে দৈনিক ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টা রোগীর পাশে বসে থেকে রোগীকে পর্যবেক্ষন করেছেন, অক্সিজেন সংমিশ্রন (Saturation) ৯৪-৯৬% নিশ্চিত করার জন্য প্রতি মিনিটে ন্যূনতম ৬ লিটার অক্সিজেন সরবরাহ এবং তারা ৯ (নয়) রকমের এন্টিবায়োটিক ১০ দিনে বিধি ব্যবস্থা দিয়েছেন। এত ধরনের এন্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার অবশ্যি প্রশ্ন সাপেক্ষ। সম্ভবত : নিজেদের উপর আস্থার অভাব এবং গুরুত্বপূর্ণ? বয়ষ্ক রোগী বিধায় রোগীর অবস্থার দ্রæত উন্নতির জন্য বিশেষজ্ঞগন ঘন ঘন এন্টিবায়োটিক বদলিয়েছেন। ষ্টেরয়েড ব্যবহার করেছেন। তার বুকের এক্সরেতে উভয় দিকে (Bilateral) নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তার রক্তের মৌলিক পরীক্ষা (CBC) স্বাভাবিক ছিল তবে সি রিএকটিভ প্রোটিন CRPও D- Timer বৃদ্ধি পায়। সালবুটামল ও বুডেসোনাইড দিয়ে নেবুলাইজার শুরু করা হয়। অধ্যাপক তারিক আলমের পদ্ধতি অনুসরন করা হয় এন্টিহেলমিনথিক ইভারম্যাকটিন ও এন্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড দিয়ে। ¯স্লেড পদ্ধতিতে প্রতিদিন ডায়ালাইসিস করানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমোটোলজীর অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমদ খানের পরামর্শে তিনবার প্লাজমা ট্রান্সফিউশন দেয়া হয়। প্লাজমা ট্রান্সফিউশনে রোগী উজ্জীবিত হন, প্রানশক্তি বৃদ্ধি পায়। শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক হানিফ ও একই পরামর্শ দিয়েছিলেন।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী সপ্তাহে তিন বার হেমোডায়ালাইসিস নিচ্ছেন বিগত ৪ (চার) বৎসর যাবত । সংগে পাচ্ছেন উচ্চ রক্ত চাপের চিকিৎসা। গত বছর রোগী হেপাটাইটিস সি (Hepatitis-C) এর জন্য Sofosbuvir ও Daclatasvir দিয়ে ৩ মাস চিকিৎসা করিয়ে হেপাটাইটিস সি (Hepatitis-C) মুক্ত হয়েছেন। তার একটা পুরানো মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন (Myocardial Infarction) রয়েছে।

* করোনা আক্রান্ত সকল গণস্বাস্থ্য কর্মী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের খরচে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল ও গণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অন্যান্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিনা খরচে সকল পরীক্ষা ফ্রি চিকিৎসা পেয়ে থাকেন। কর্মীকে কেবল খাওয়া খরচ বহন করতে হয়।

ছক-১ : সামাজিক শ্রেণী ভিত্তিক গণস্বাস্থ্য ICU তে প্রতিদিনের সর্বমোট চার্জ

এই প্যাকেজে সকল ওষুধের মূল্য, অক্সিজেন, রোগ নির্ণয় বিল, ICU ভাড়া, যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ফি ধরা আছে। অতিরিক্ত কোন খরচ নেই। বিশেষজ্ঞগন দিনে রাতে যতবারই রোগীকে পরিদর্শন করবেন ও পরীক্ষা করবেন অতিরিক্ত কোন ফি চার্জ হবে না।

রোগ নির্ণীত হবার পর রোগীকে প্রথম দশ দিন ICU তে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়, পরবর্তীতে রোগীকে কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রোগী করোনা মুক্ত (COVID-19 Negative) হন ১৩ জুন ২০২০ তারিখে, তবে এখনও Post COVID- Fatigue (কভিড উত্তর পরিশ্রান্তি) রোগে ভুগছেন এবং হাসপাতালে আছেন।

ছক-২ : শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনের শ্রেণীভিত্তিক দৈনিক চার্জ

বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় অত্যাধিক যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠির ক্রয় ক্ষমতার বাইরে, যা পূর্বে বলা হয়েছে, নিজ পকেট থেকে চিকিৎসার জন্য ব্যয় (Out of Pocket = OOP) পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রয়োজনে প্রথম দুই সপ্তাহ গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় (ICU) তে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে রোগীর আর্থিক বিবেচনায় হয় কেবিনে কিংবা দরিদ্র রোগী সরাসরি জেনারেল ওয়ার্ডে স্থানান্তরিত করা হয় যার চার্জ খুবই কম।

ছক-৩ : গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে অবস্থান কালে 10 জুলাই 2020 খরচের বিশ্লেষন

* এই খরচের মধ্যে রোগীর আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া (Transport), খাওয়া দাওয়া, সেবিকা (আয়া) রাখা বিভিন্ন শ্রেণীর বেতনবিহীন কর্মীদের চাহিদা, বকশিশ, প্রভৃতির খরচ হিসেবে ধরা হয়নি।

শেষের কথা : সরল কথা

১. নিজ বাসায় পরিবারের ¯েœহ ভালবাসায় আলাদা ঘরে থেকে সাধারন চিকিৎসায় প্রায় ১০০% রোগী সুস্থ হয়ে উঠেন। খরচ খুবই কম। গণ স্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিকেলসের জি-পারাসিটামল (মূল্য প্রতি টেবলেটের সত্তর পয়সা, জি-এন্টিহিষ্টামিন পঁচিশ পয়সা, জি-ভিটামিন সি এক টাকা ত্রিশ পয়সা) ও ষ্টীম বাষ্প দিনে কয়েকবার ব্যবহার করুন, মধুও খাবেন।

২. হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিলে হাসপাতালে বিশেষে খরচ দৈনিক দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। তবে নিরাময়ের হার দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ৯০%।

৩. অধিকাংশ হাসপাতালে ICU তে চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয় বহুল। ব্যয় দিনে ৫০,০০০-১৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার থেকে দেড় লাখ) টাকা, নামী দামি অপ্রমানিত ও ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহারে এবং অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষায়। দেশের সকল ICU তে পর্যাপ্ত সেবার ব্যবস্থা নেই। ICU তে প্রশিক্ষন প্রাপ্ত পর্যাপ্ত জুনিয়র চিকিৎসক ও নার্স ICU তে নেই; ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা ও পাশর্^ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত এবং তারা দ্রæত দৌড়ে সেবা দিতে অভ্যস্ত নন। দেশের সেরা ICU বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজীব মোহাম্মদকে দ্রæত প্রশিক্ষন ব্যবস্থা প্রচলনের জন্য দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।

স্মরণ রাখবেন চিকিৎসক ও সেবিকাদের অক্লান্ত সেবার পরও ICU তে মৃত্যুহার খুব বেশী। ICU তে মৃত্যুহার ৫০% অতিক্রম করতে পারে।

৪. ওষুধ কোম্পানী নিয়ন্ত্রিত Indicative Price (IP) প্রথা অনতিবিলম্বে বাতিল করে সরকার ১৯৮২ সনের ‘জাতীয় ওষুধনীতি ১৯৮২’ এর পুরো অনুসরন করে এবং সুনির্দিষ্ট ভাবে রোগ নির্ণয় পরীক্ষার এবং অপারেশনের দর স্থির করে দিয়ে পুরোপুরি কার্যকর করে ওষুধের সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য (MRP) ধার্য করলে ক্রয়ে এবং বিভিন্ন পরীক্ষার চার্জ সমূহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৫০% কমবে।

৫. সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে এবং সকল ক্লিনিকের রেজিষ্ট্রেশনের নিয়মাবলী সহজ হওয়া প্রয়োজন। সরকার ন্যূনতম যন্ত্রপাতির তালিকা স্থির করে দেবেন, কয়জন ডাক্তার, কয়জন ডিপ্লোমা পাশ নার্স থাকতে হবে, এ নিয়ে সরকারের কাগজে নির্দেশনা কেবল দূর্নীতি বাড়াবে, বহু- ‘‘রিজেন্ট সাহেদ” তৈরী করছে এবং আরও নতুন করে তৈরী হবে, সংগে দূর্নীতি। প্রাইভেট প্রাকটিসে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ফি (Consultation) চিকিৎসক নিজে স্থির করবেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের নাক না গলানোই উত্তম। কয়জন চিকিৎসক, কয়জন নার্স (সেবিকা) টেকনিশিয়ান দিয়ে ক্লিনিক চালাবেন তা বেসরকারী হাসপাতাল/ ক্লিনিক মালিকরা স্থির করবেন। ব্যক্তি মালিকরা লাভ ও সেবা দুইটাই ভাল বুঝেন।

৬. সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর নির্ভর করছে সকল নাগরিকের সুলভে সহজে উন্নতমানের চিকিৎসা সেবা প্রাপ্যতা। বাংলাদেশে সামাজিক শ্রেনীভিত্তিক জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা (Social Class Based National Health Insurance) বিবেচনার সময় এসেছে।

সর্বশেষ

পটেটোর প্যাকেট আনতে গিয়ে পানিতে ডুবে দুই বছরের শিশুর মৃত্যু

সুজন চৌধুরী, আলীকদম: বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়নে পানিতে ডুবে সিফাত মনি নামের দুই(২) বছরের কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে।পানিতে ডুবে মৃত্যু হওয়া সিফাত মনি...

মৃত্যু থামছেই না রামেকের করোনা ইউনিটে

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘন্টায় আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩ করোনা পজেটিভ ছিলেন। অন্য ৭ জন উপসর্গ...

সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাঃ জাফরুল্লাহ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে রেখে জাতীকে মেরুদণ্ডহীন করে দিচ্ছে উল্লেখ করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, এই সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল শিক্ষা...

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ থাকতে পারবে না : মান্না

নাগরিকের ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, তিনি জানেন যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হয়, যদি হলগুলো খুলে দেওয়া হয় তাহলে হলে বিরোধীদলীয় ছাত্ররা ঢুকবে। তখন...