শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২০
সাম্প্রতিক শিরোনাম

আজ শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০
১৫ই কার্তিক ১৪২৭, ১৩ই রবিউল আউয়াল ১৪৪২

মেডিক্যালে ভর্তি জালিয়াতি করে প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র বের করেন মেশিনম্যান সালাম

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের (আগের ব্যুরো) প্রেস থেকে মেশিনম্যান আব্দুস সালাম মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তাঁর খালাতো ভাই জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে মুন্নুকে দিয়েছেন।

জসিমের মাধ্যমে কয়েকজন চিকিৎসক, কয়েকটি কোচিং সেন্টার এবং কিছু ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র পেয়ে যায়।

২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এভাবে মেডিক্যাল ও ডেন্টালে ভর্তির প্রশ্নপত্র ফাঁস করে চক্রটি।

সোমবার রাজধানীর বনশ্রীর জি- ব্লক থেকে স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রেসের সাবেক মেশিনম্যান আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করার পর এসব তথ্য জেনেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে সালামকে গ্রেপ্তারের অভিযান ও তদন্তের ব্যাপারে জানানো হয়। গতকালই ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

২০১৫ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো থেকে সাময়িক বরখাস্ত এবং একটি হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি হয়ে সালাম গাঢাকা দেন।

এর পরও তাঁর প্রশ্নপত্রচক্রটি ভর্তি জালিয়াতি চালিয়েছে।

২০১৩ সাল থেকেই মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস জালিয়াতি চলছে। ২০১৫ সালে এই জালিয়াতির সঙ্গে প্রেসের কর্মী, তাঁদের আত্মীয়, মেডিক্যালের শিক্ষার্থী ছাড়াও চিকিৎসকরা জড়িয়ে পড়েন। এরই মধ্যে অন্তত দেড় শ জনের নাম উঠে এসেছে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ২০০৬ সালে এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসক জেড এম এ সালেহীন শোভন চক্রের অন্যতম হোতা।

জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তির পাশাপাশি চক্রের সহযোগী হয়েছেন বরিশাল মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী মাহমুদা পারভীন ঋতু, সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের রিয়াদ এবং ইব্রাহিম কার্ডিয়াক মেডিক্যাল কলেজের মুবিন।

মেডিক্যালে ভর্তির প্রশ্ন ফাঁসের মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ১০ আসামির মধ্যে ছয়জনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অনেক তথ্য উঠে এসেছে বলে জানায় সূত্র।

একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের গাড়িচালক আব্দুল মালেক প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। এই বিষয়টিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পাশাপাশি সালামকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর সঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষার আর কেউ জড়িত আছে কি না তা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে যেসব চিকিৎসক ও কোচিং সেন্টারের নাম এসেছে, তাদের ব্যাপারেও ব্যাপকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।

গতকাল সিআইডির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম বলেন, আসামিদের কাছ থেকে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত জসিমের খালাতো ভাই সালামই প্রশ্নপত্র ফাঁসের হোতা।

তাঁর মাধ্যমেই প্রশ্নপত্র বের হতো এবং জসিম তাঁর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেন। তদন্ত করতে গিয়ে পাঁচ-ছয়জন চিকিৎসকের নাম আসে। তিন-চারটি কোচিং সেন্টারের নামও আসে, যাদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র চলে যেত।

এসব চিকিৎসকের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলে তিনি জানান।

পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম বলেন, ২০১৫ সালে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর থেকেই সালাম পলাতক ছিলেন। ওই বছরই মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে সাইফুল ইসলাম কমল নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে মানিকগঞ্জের সিআইডি অভিযোগপত্র দেয়।

পুলিশ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, সালামের ব্যাংকে টাকা জমানোর চেয়ে জমি কেনার নেশা ছিল। তাঁর সম্পদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে জসিমের ৩৮টি ব্যাংক হিসাবে ২১ কোটি ২৭ লাখ ও তাঁর স্ত্রীর ১৪টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় পৌনে চার কোটি টাকার সন্ধান মিলেছে।

তাঁর কাছ থেকে দুই কোটি ৩০ লাখ টাকার চেক ও দুই কোটি ২৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পাওয়া গেছে।

সিআইডি সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁস তদন্তের সূত্রে মেডিক্যালের প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য পায় সিআইডি। গত ১৯ ও ২০ জুলাই রাজধানীর মিরপুর থেকে চক্রের মূল হোতা জসিম, সহযোগী সানোয়ার হোসেন, মোহাইমিনুল ওরফে বাঁধন, জসিমের ছোট বোনের স্বামী জাকির হোসেন দিপু ও ভাতিজা পারভেজ খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০ জুলাই ৯ জনের নাম উল্লেখসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করে সিআইডি।

এরই মধ্যে জসিমের বোন শাহজাহী আক্তার মিরা, ভগ্নিপতি আলমগীর হোসেন, সহযোগী মুবিন ও ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ড শেষে সানোয়ার, আলমগীর, দিপু, পারভেজ, ইমন ও মুবিন আদালতে জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে সানোয়ার ২০১৩ ও ২০১৫ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা স্বীকার করেন।

তাঁদের সঙ্গে সালাম ও ডা. শোভন ছাড়াও মেডিক্যালের কিছু শিক্ষার্থী জড়িত বলেও জানান সানোয়ার। মেডিক্যালের চারজনই ভর্তির চুক্তির ব্যাপারে লিয়াজোঁ করতেন বলে জানান তিনি।

তদন্ত সূত্র জানায়, মেডিক্যালে ভর্তি চক্রের অন্যতম হোতা ডা. জেড এম এ সালেহীন শোভনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখীলের নারায়ণপুরে।

২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন শোভন ও জসিম। এরপর জামিনে ছাড়া পেয়ে যান তাঁরা।

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী মাহমুদা পারভীন ঋতু, সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের রিয়াদ এবং ইব্রাহিম কার্ডিয়াক মেডিক্যাল কলেজের মুবিন ভর্তির পাশাপাশি চক্রে সহায়তা করেছেন।

এমন আরো অন্তত শতাধিক শিক্ষার্থীর নাম পাওয়া গেছে, যারা জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কলেজগুলোকে তাঁদের ব্যাপারে তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

২০১৫ সালে মেডিক্যাল ও ডেন্টালের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘেরাও এবং উচ্চ আদালতে রিট করা হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি নাকচ করে দেয়।

সর্বশেষ খবর

জনপ্রিয় খবর