সাম্প্রতিক শিরোনাম

চামড়ার বাজারে ধস

সারাদেশে কোরবানির চামড়া বেচাকেনায় ধস নেমেছে। সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ায় পানির দরে বিক্রি হয়েছে কোরবানির চামড়া।

hiastock

দাম না পেয়ে রাজশাহীতে পদ্মা নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে ছাগল ও গরুর চামড়া। সঠিক দাম নিশ্চিত না হওয়ায় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে ১৫ হাজার পিস চামড়া ডাম্পিং করা হয়েছে। চরম নৈরাজ্যের মুখে পড়েছে কোরবানিকেন্দ্রিক চামড়া বাণিজ্য। চামড়ার বাজারে এমন নৈরাজ্যের পেছনে প্রধান চারটি কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

চামড়া থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মুখ ফিরিয়ে নেয়া, করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম হ্রাস, ট্যানারি মালিকদের অর্থ সঙ্কটের অজুহাত এবং সমন্বয়হীনতা। এ ছাড়া কোরবানির দুইদিন আগে কাঁচা চামড়া রফতানির ঘোষণা দেয়া হলেও ওই সময়ের মধ্যে চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিতে পারেনি কেউ। ট্যানারি মালিক ও আড়তদার ব্যবসায়ীদের বাইরে কারও কাছে চামড়া বেচার সুযোগ পায়নি কেউ। এতে করে কোরবানির চামড়ার দাম আরও কমে যায়।

গতবারের বিরূপ অভিজ্ঞতায় এবার করোনা মহামারীর মধ্যে চাহিদা কম থাকবে এমন আশঙ্কা ছিল মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। আর এ কারণে কোরবানির দিন পাড়া মহল্লায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দেখা যায়নি। পোস্তার আড়তদার ও সাভারের ট্যানারি মালিকরা দাবি করেছেন, সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া বেচাকেনা হয়েছে।

লবণযুক্ত চামড়া নির্ধারিত দামে বিক্রি হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় প্রতিটি ভালমানের গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে আকারভেদে মাত্র ১৫০-৬০০ টাকায়। ঢাকার বাইরে ৫০-১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে প্রতিপিস চামড়া। এছাড়া ছাগলের চামড়া ২-১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হলে প্রতিপিস গরুর চামড়া ১২০০-১৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া উচিত ছিল।

কোরবানির দিন ঢাকায় ফড়িয়া ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দেখা যায়নি। সাধারণত তিনহাত ঘুরে আড়ত ও ট্যানারি মালিকরা চামড়া পেয়ে থাকেন। কোরবানিদাতার কাছ থেকে সরাসরি নির্দিষ্ট দাম দিয়ে চামড়া কিনেন মৌসুমি ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা। এবার ঢাকায় সারাদিন শেষে বিকেলেও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দেখা যায়নি। মাদ্রাসা ও মসজিদের ছাত্ররা কিছু চামড়া নিজ দায়িত্বে সংগ্রহ করেছে। এছাড়া অনেকে মসজিদ বা মাদ্রাসায় গিয়ে চামড়া দিয়ে এসেছে। তবে মসজিদ ও মাদ্রাসা থেকে কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী পানির দামে ২০০-৩০০ টাকায় এসব চামড়া কিনে নিয়েছে।

রবিবার পুরান ঢাকার পোস্তা এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনেছেন পাইকাররা। গতবারের বিরূপ অভিজ্ঞতায় এবার মহামারীর মধ্যে চাহিদা কম থাকবে ধরে নিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন ফড়িয়া ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এর পাশাপাশি ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের কয়েক শ’ কোটি টাকা পাওনা বকেয়া পড়ে থাকা এবং মহামারীকালে বিশ্ব বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া চামড়ার দরপতনে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। সরকার কোরবানির পশুর চামড়ার নির্ধারিত দাম বেঁধে দিলেও বাস্তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর চেয়ে অনেক কম দামেই বেচাকেনা হয়েছে।

ঈদের দিন ও রবিবার ঈদের দ্বিতীয় দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে দুই শ’ টাকায়ও, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এক বছর আগেও এসব চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় হাতবদল হয়েছে। এবার যত বড় চামড়াই হোক কেন কোরবানিদাতা কিংবা সংগ্রহকারী ৬০০ টাকার বেশি দাম পাননি।

সরকার প্রতিবর্গফুট লবণযুক্ত চামড়া ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকায় নির্ধারণ করে দিয়েছে। অর্থাৎ আড়তদাররা মাঝারি মানের (২২ ফুট আয়তন) একটি চামড়া ট্যানারিতে বিক্রি করবেন ৭৮০ টাকা থেকে ৯০০ টাকায়। গত বছর এসব চামড়া বিক্রি হয়েছিল এক হাজার থেকে ১২০০ টাকায়। এই বছর একই মানের চামড়াই কোরবানিদাতাদের কাছে থেকে কেনা হয়েছে গড়ে ৩০০-৪০০ টাকা দরে।

সুযোগে দালাল, ফড়িয়া, ব্যাপারি, আড়তদার এমনকি এই খাতের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ট্যানারিগুলোর মুনাফা বাড়ার পথ উন্মুক্ত হলেও কেউ দায় নিতে রাজি নয়। দেশে চামড়ার চাহিদার বেশিরভাগ অংশই পূরণ হয় কোরবানির ঈদে জবাই হওয়া পশু থেকে। এবার ৭০ লাখ গরু জবাই হবে বলে ধারণা করা হলেও হয়েছে ৫০ লাখের মতো বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। ছাগল ২০ লাখ জবাই হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কোরবানিদাতার কাছ থেকে তা কিনে নেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা, যাদের ফড়িয়া বলা হয়। তাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কেনেন আড়তদাররা। সেই চামড়া লবণ মাখিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার পর বিক্রি করা হয় ট্যানারিতে, যেখানে তৈরি হয় চামড়াজাত নানা পণ্য। গত বছর ফড়িয়ারা যে দরে চামড়া কিনেছিলেন, বিক্রি করতে গিয়ে লাভ তো দূরের কথা কেনা দামও পাননি।

অনেকে চামড়া রাস্তায় ফেলে গিয়েছিলেন কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলেছিলেন। এবার করোনাভাইরাস মহামারীতে চামড়ার সরকারী দরও কমে যাওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ হারান। ফলে অনেক স্থানে কোরবানির চামড়ার ক্রেতাই পাওয়া যাচ্ছিল না। ঈদের দিনের মতো দ্বিতীয় দিন রবিবারও দেখা গেছে একই চিত্র। ঢাকার খিলগাঁও সি ব্লকের একটি বাড়িতে সকালে কোরবানি শেষ হলেও দুপুর ৩টা পর্যন্ত চামড়ার কোন ক্রেতা ছিলেন না।

চামড়া কী করবেন- জানতে চাইলে ওই বাড়ির মালিক শেখ জামাল উদ্দিন বলেন, গত দুইদিনে কেবলমাত্র আপনিই (ক্রেতা ধারণা করে) চামড়া কিনতে আসলেন। যা দাম পাই ছেড়ে দেব। তিনি বলেন কোন ক্রেতা চোখে পড়েনি, তাহলে তো দাম পড়বেই। এবার সিন্ডিকেট করে একেবারে ধসায়া দিছে। তিনি বলেন, কোন মাদ্রাসা থেকেও কেউ নিতে আসছে না। ফকিরাপুল পরিচিত একটি মাদ্রাসা আছে। বিকেলে কেউ একজন সেখানে জমা দিয়ে আসবে।

আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড এ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আফতাব বলেন, মাঠে যত কম দামই থাকুক না কেন, পোস্তার আড়তদাররা সরকার নির্ধারিত মূল্যেই চামড়া কিনছেন। একই কথা জানালেন বাংলাদেশ ট্যানারি এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ শাহিন আহমেদ। তিনি বলেন, সাভারে গিয়ে দেখুন সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বেচাকেনা হচ্ছে। তিনি বলেন, যারা চামড়া আনছেন তারা কেউ লবণযুক্ত চামড়া আনছেন না।

প্রতিটি চামড়ার মধ্যে দেড় শ’ থেকে দুই শ’ টাকা চালান দিতে হয়। সেই হিসাব ধরে মাঝারি মানের চামড়াগুলো ৬০০ টাকা করে কেনা হয়েছে। এর থেকে বেশি দিয়ে কিনতে গেলে সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী আড়তের লভ্যাংশ থাকে না। এখন কেউ যদি মাঠ পর্যায়ে ৩০০-৪০০ টাকায় চামড়া কেনে, সেটা ভিন্ন হিসাব। দেখা গেছে ৩০০ টাকায় কিনে অনেকে আড়তে ৬০০ টাকা করে বিক্রি করছেন, অর্থাৎ অতি মুনাফা করছেন।

রবিবার বেলা ৩টার দিকে মিরপুর রোডের ধানমণ্ডি এলাকায় দেখা যায়, সাভার-আমিনবাজারের বিভিন্ন ট্যানারির প্রতিনিধি ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায় ২০ থেকে ৩০ বর্গফুট আয়তনের চামড়া কিনে নিচ্ছেন। নিজেকে ঢাকা ট্যানারির প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে শামসুল আলম নামের একজন ক্রেতা বলেন, রবিবার সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা করে তারা চামড়া কিনছেন। শনিবার গড়ে ৫০০ টাকা করে চামড়া কেনা হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গরুর চামড়া আকারভেদে ১৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ২ থেকে ১০ টাকায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে চামড়াশিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে। আবার দরপতন ঠৈকাতে ২৯ জুলাই কাঁচা ও ওয়েট-ব্লু চামড়া রফতানির অনুমতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। চামড়া ঠিকই কিনেছেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকেরা। পোস্তাতেই গতবারের তুলনায় বেশি চামড়া সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

গতবারের চেয়ে এবার কোরবানি কম হওয়ার কথা জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকেরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম কোরবানি হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি কোরবানি হয়। আমরা সরকার নির্ধারিত দামে লবণযুক্ত চামড়া কেনা শুরু করব। যারা কম দামে চামড়া কিনেছে, তারা আমাদের পরিচিত নয়।

খাতের বিতরণকৃত ঋণের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপী। আর এ কারণে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর অনীহা রয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ আরও বলেন, চামড়া কিনতে সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করে জনতা ব্যাংক। তবে এবার ব্যাংকটি চামড়া কিনতে কোন ঋণ দেয়নি। আমরা আশা করছি, অফিস খোলার দু-এক দিনের মধ্যে ব্যাংকটি টাকা দেবে। যেসব ট্যানারি ঋণ পাবে না, তারা চামড়া কিনতে পারবে না।

চট্টগ্রামে এবার লোকসানেও বিক্রি করা যায়নি কোরবানির পশুর চামড়া। মাঠ পর্যায় থেকে সংগ্রহ করা চামড়াগুলো বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। অবশেষে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি ডাম্পিং করেছে প্রায় ১৫ হাজার পিস চামড়া। গত বছরের অভিজ্ঞতায় এবার চামড়ার ব্যবসা ভাল হবে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল আরও নাজুক।

রাজশাহীতে এবার কোরবানির চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির চেয়েও কম দরে। গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম ২০-২৯ শতাংশ কমিয়ে নির্ধারণ করেছিলো সরকার। সেই দামও পাওয়া যায়নি চামড়া বিক্রির সময়। ছাগলের চামড়া রাজশাহীতে ৫ থেকে ৩০ এবং গরুর চামড়া ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

ঈদের দিন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অবশ্য একটু বেশি দামে চামড়া কিনেছিলেন। তবে তারা ধরা খেয়েছেন। আড়তে বিক্রি করতে না পেরে সেই চামড়া পদ্মা নদীতেও ফেলে দিতে দেখা গেছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার তারাই ঠিকমতো বাজার বুঝতে পারেননি।

সর্বশেষ খবর

জনপ্রিয় খবর

hiastock